১৯১৮ সালেও ভয়াবহ এক মহামারি দেখা দিয়েছিল। তখনও সবাইকে মাস্ক পরার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বহু মানুষ সেই নির্দেশের প্রতি কোনো তোয়াক্কাই করেন নি। ফলে ওই মহামারিতে যুক্তরাষ্ট্রে কমপক্ষে ৬ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ মারা যায়। তখনও স্কুল কলেজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মৃত্যু ঠেকানো যায় নি মানুষের অবহেলার কারণে। […]
১৯১৮ সালেও ভয়াবহ এক মহামারি দেখা দিয়েছিল। তখনও সবাইকে মাস্ক পরার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু বহু মানুষ সেই নির্দেশের প্রতি কোনো তোয়াক্কাই করেন নি। ফলে ওই মহামারিতে যুক্তরাষ্ট্রে কমপক্ষে ৬ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ মারা যায়। তখনও স্কুল কলেজ, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, অফিস আদালত বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু মৃত্যু ঠেকানো যায় নি মানুষের অবহেলার কারণে। করোনায় যেন সেই ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। অনলাইন দ্য বিস্ট-এ এমন কথাই লিখেছেন ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানের সেন্টার ফর দ্য হিস্টোরি অব মেডিসিনের সহকারি পরিচালক জে. আলেকজান্দার নাভারো।
দীর্ঘ ওই নিবন্ধে তিনি বলেছেন, এরই মধ্যে আমরা উদ্বেগজনক সব সংবাদ শিরোনাম দেখেছি। বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৪০টি রাজ্যে করোনা ছড়িয়ে পড়েছে। নতুন আক্রান্তের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উদ্বেগজনক হারে হাসপাতালে ভর্তির সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ অবস্থায় বহু স্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মকর্তা সতর্ক করেছেন এই বলে যে, দ্রুততার সঙ্গে করোনা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়া বন্ধ করতে যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যবস্থা নিতেই হবে। যদি তা না হয় তাহলে এই মহামারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। বেশির ভাগ মানুষই একমত যে, মার্কিনিদেরকে প্রকাশ্য স্থানগুলোতে মাস্ক পরা উচিত। সামাজিক দূরত্ব রক্ষা করা উচিত। এসব নিয়ম বেশির ভাগ মার্কিনি মানছেন। মাস্ক পরছেন। কিন্তু বিপুল সংখ্যক মানুষকে সেটা মানানো যাচ্ছে না। স্থানীয়ভাবে মাস্ক পরার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হয়েছে অ্যারিজোনার স্কটসডেল, টেক্সাসের অস্টিনে। ওয়াশিংটন এবং নর্থ ক্যারোলাইনার বেশ কিছু শেরিফ ঘোষণা দিয়েছেন, তাদের রাজ্যে মাস্ক পরা বাধ্যতামুলক করবেন না।
এরপরেই আলেকজান্দার নাভারো লিখেছেন, ১৯১৮ সালের মহামারির ইতিহাস নিয়ে আমি বিস্তর গবেষণা করেছি। তাতে দেখা গেছে, ওই সময়ও কার্যকর কোনো টিকা বা ওষুধ ছিল না। তখনও জনস্বাস্থ্য রক্ষায় কিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল স্কুল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। মানুষের জমায়েত নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। যারা আক্রান্ত হয়েছিলেন তাদেরকে আইসোলেট করে কোয়ারেন্টিনে নেয়া হয়েছিল। অনেক সম্প্রদায়কে মুখে মাস্ক পরতে বলা হয়। কিন্তু তাতে বিরক্তি বোধ করেন অনেকে। ১৯১৮ সালের মধ্য অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ব্যাপক হারে দেখা দেয় মহামারি, তা দ্রুত পুরো দেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের পাবলিক হেলথ সার্ভিস লিফলেট বিতরণ করতে থাকে। তাতে সব নাগরিককে মুখে মাস্ক পরতে বলা হয়। একই আহ্বান জানিয়ে পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেয় রেডক্রস। কিভাবে মাস্ক তৈরি করা যায় তার বর্ণনা দেয়া হয় তাতে। কোনো কোনো রাজ্যের স্বাস্থ্য বিভাগ তাদের নিজেদের উদ্যোগে কাজ শুরু করে। এর মধ্যে রয়েছে ক্যালিফোর্নিয়া, ইউটা এবং ওয়াশিংটন। নাগরিকদের মাস্ক পরার আহ্বান জানিয়ে পোস্টার টানিয়ে দেয়া হয় দেশজুড়ে। কিন্তু স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বুঝতে পারলেন আকস্মিকভাবে জনগণ এই পাল্টে দেয়া জীবনধারণ প্রক্রিয়া সহজভাবে নিচ্ছে না। অনেকেই মাস্ক পরাকে অস্বস্তিকর মনে করতে থাকেন। এতে সতর্কতা দেয়া হয়। বলা হয়, মাস্ক না পরলে বহু মানুষ ভয়াবহ ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ফলে পশ্চিমে অনেক স্থানে মাস্ক পরা বাধ্যতামুলক করা হয়। কোথাও কোথাও মাস্ক না পরলে স্বল্প সময়ের জেলের বিধান করা হয়। ৫ ডলার থেকে ২০০ ডলার পর্যন্ত জরিমানার বিধান করা হয়। তবে এই অর্ডিন্যান্স পাস করানোটা সহজ ছিল না। যেমন আদেশ কার্যকর করার জন্য শহরের কর্মকর্তাদের আয়ত্তে আনতে স্যাক্রামেন্টোর স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বেশ কয়েক দফা উদ্যোগ নেন। অরিগন রাজ্যের পোর্টল্যান্ডে একটি খসড়া প্রস্তাব নিয়ে তো সিটি কাউন্সিলে উত্তপ্ত বিতর্ক হয়। সেখানে একজন কর্মকর্তা এ পদক্ষেপকে স্বৈরতান্ত্রিক এবং অসাংবিধানিক বলে আখ্যায়িত করেন। এমনিভাবে সরকারি পর্যায়েই মাস্ক পরা নিয়ে অনেক স্থানে, রাজ্যে বিতর্ক হয়। মহামারি যখন ক্রমাগত বাড়ছেই তখন ওকল্যান্ডে দ্বিতীয় দফা মাস্ক পরা নিয়ে বিতর্ক হয়। স্যাক্রামেন্টোতে গ্রেপ্তার করা হয় কাউকে কাউকে। একজন সুপরিচিত চিকিৎসক মাস্ক পরার বিরুদ্ধে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, যদি কোনো গুহামানব বেরিয়ে আসে, তাহলে তিনি সবাইকে দেখে ভাববে চাঁদের দেশের মানুষ।
যেসব স্থানে মাস্ক পরার রীতি সফলভাবে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল, সেখানেও দ্রুত কিছু সমস্যা দেখা দিয়েছিল। অনেক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে মাস্কছাড়া কাস্টমার গিয়ে হাজির হতে থাকেন। কিন্তু ব্যবসার স্বার্থে তাদেরকে ফিরিয়ে দেয়া হয় নি। এ ছাড়া কর্মজীবীরা সারাদিন মাস্ক পরে থাকা অস্বস্তিকর বলে মন্তব্য করতে থাকে। ডেনভারে একজন সেলসপারসন তো মাস্ক পরতে অস্বীকৃতি জানান। তিনি বলেন, যখনই তিনি মাস্ক পরেন, তখনই তা নাকের ওপর থেকে পিছলে পড়ে। স্থানীয় একটি পত্রিকার রিপোর্টে বলা হলো, মাস্ক পরার রীতি পুরোপুরি অবজ্ঞা করছে লোকজন। এক পর্যায়ে মাস্ক পরা শুধু গণপরিবহনের কনডাক্টরদের জন্য প্রযোজ্য বলে আইন সংশোধন করা হলো। কিন্তু তাতে ধর্মঘটের হুমকি দেয়া হয়। সিয়াটলে কনডাক্টররা মাস্কছাড়া যাত্রীদের গাড়িতে তুলতে কোনোই আপত্তি করলেন না। আইন অমাণ্য এমন পর্যায়ে পৌঁছল অকল্যান্ডে যে, কর্মকর্তারা যুদ্ধকালীন সেবার বেসামরিক স্বেচ্ছাসেবকদের ৩০০ জনকে দায়িত্ব দিলেন আইন লঙ্ঘনকারীদের নাম ও ঠিকানা সংগ্রহে। যাতে তাদেরকে শাস্তি দেয়া যায়। মাস্ক পরার আদেশ স্যাক্রামেন্টোতে কার্যকর হওয়ার পর একজন পুলিশ প্রধান তার কর্মকর্তাদের নির্দেশ দিলেন। বললেন, রাস্তায় যাকেই মাস্কছাড়া দেখবে তাকে ধরে আনো এবং ওয়াগনে পাঠিয়ে দাও। এর ২০ মিনিটের মধ্যে আইন লঙ্ঘনকারীতে সয়লাব হয়ে গেল। সান ফ্রান্সিসকোতে এত বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হলো যে, সেখানকার জেলখানায় আর স্থান সংকুলান হচ্ছিল না। মামলার জট লেগে যায়। সেই মামলার ফয়সালা করতে বিচারক ও কর্মকর্তাদের রাত জেগে কাজ করতে হলো। ১৯১৯ সালের ২৫ শে জানুয়ারি ‘এন্টি মাস্ক লিগ’-এর প্রায় ২০০০ সদস্য সান ফ্রান্সিসকোতে পুরনো ড্রিমল্যান্ড রিঙ্ক-এ সমবেত হন। উদ্দেশ্য মাস্ক বিষয়ক অর্ডিন্যান্সের বিরোধিতা করা এবং তা প্রত্যাহার করা। এতে যোগ দেন বেশ কিছু সুপরিচিত চিকিৎসক এবং সান ফ্রান্সিসকো বোর্ড অব সুপারভাইজরসদের একজন সদস্য।
ফলে ১৯১৮ সালে মাস্ক ব্যবহারের কার্যকারিতা সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে বলা কঠিন। কিন্তু এখন কাপড়ে তৈরি মাস্ক পরায় কোভিড-১৯ সংক্রমণ কমে আসার ক্ষেত্রে একটি কার্যকর হাতিয়ার বলে ক্রমশ আস্থা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
| রবি | সোম | মঙ্গল | বুধ | বৃহ | শুক্র | শনি |
|---|---|---|---|---|---|---|
| ১ | ২ | ৩ | ৪ | ৫ | ||
| ৭ | ৮ | ৯ | ১০ | ১১ | ১ | |
| ১৩ | ৪ | ১৫ | ১৬ | ১ | ৮ | ১৯ |
| ২০ | ২১ | ২২ | ২৩ | ২৪ | ২৫ | ২৬ |
| ২৭ | ২ | ৯ | ৩০ | |||