ঢাকা , বুধবার, ০৪ ফেব্রুয়ারী ২০২৬, ২২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
আপডেট :
রাসেল ও সোহেল এর নেতৃত্বে সংযুক্ত আরব আমিরাত জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন পর্তুগালে বর্ণাঢ্য আয়োজনে বিজয় মেলা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সম্পন বড়লেখায় দুর্বৃত্তদের হামলায় নিজ বাড়িতে দুই ভাই খুন মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে পর্তুগাল বিএনপির আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত বড়লেখা বিএনপির গ্রুপিং, কেন্দ্রীয় হস্তক্ষেপ ছাড়া সমাধান সম্ভব নয় যথাযোগ্য মর্যাদায় মহান বিজয় দিবস পালন করেছে বাংলাদেশ দুতাবাস পর্তুগাল মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে পর্তুগাল বিএনপির আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত কাজা দো বাংলাদেশ’র উদ্যোগে পর্তুগালে মহান বিজয় দিবস উদযাপন ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপলক্ষে সংবাদ সম্মেলন পর্তুগালে নতুন বেতন বিপ্লব: মন্টিনিগ্রোর উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক রূপরেখা তারেক রহমান হবেন বাংলাদেশের মাহাথির মোহাম্মদ :দেশের রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়

বিলাত ম্যানিয়া

ডা,সাঈদ এনাম
  • আপডেটের সময় : ০৪:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ নভেম্বর ২০২৫
  • / ২০৮ টাইম ভিউ

বিলাত ম্যানিয়া

বাংলাদেশের প্রাচীনতম জনপদ সিলেট—সবুজে ঘেরা, ইতিহাসে ভরা। অথচ এ জেলার কিছু গ্রাম আজ যেন “ছোট্ট লন্ডন”। কারণ, এখানকার বহু পরিবারই এখন বিলাতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। কিন্তু এই লন্ডনী জৌলুসের শিকড়টা যে কত গভীরে রক্ত-ঘামে মিশে আছে, তা আজকের প্রজন্ম জানে না, বোঝেও না।

গল্পটা শুরু প্রায় সত্তর–আশি বছর আগে। তখন আকাশে উড়োজাহাজ ছিল বিরল, হাতে ছিল না রঙিন পাসপোর্ট। বিলাত পাড়ি দিতে লাগত না আইইএলটিএস, ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা স্পোকেন ইংলিশ। ছিল কেবল সাহস, চোখে এক মুঠো স্বপ্ন, আর হাতে সাদা কাগজে একটি টিপস—যেটাই ছিল তাদের “বিলাত যাত্রার ভিসা।”

সেই সময়ের দরিদ্র গ্রামবাংলার কিছু স্বপ্নবিলাসী তরুণ একটুকরো ভালো জীবনের আশায় বুকভরা সাহস নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল অনিশ্চিত যাত্রায়। জাহাজে চড়ে, অচেনা পথ ধরে তারা ছুটে গেছে দূরদেশ বিলাতের পথে। তাদের না ছিল পুঁজি, না ছিল পৃষ্ঠপোষকতা, না ছিল আত্মীয়তার ভরসা। তবু তারা হাল ছাড়েনি। কারণ, তাদের ছিল একটাই সম্পদ—স্বপ্ন দেখার সাহস।

ভাগ্য শেষমেশ তাদের নিরাশ করেনি। কারখানায়, রেস্তোরাঁয়, পার্কে, ফুটপাতে, ডকের অন্ধকারে, নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ রাতে তারা অমানুষিক পরিশ্রমে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিল নিজের ভাগ্য। আজ তাদের বংশধরেরা পূর্বপুরুষের পরিশ্রমে গড়া রাজপ্রাসাদসম বাড়িতে বাস করে, ঝলমলে গাড়িতে চড়ে, বিদেশি পোশাকে ঘোরে। গ্রামের মানুষ সেসব বাড়িকে ডাকে—“লন্ডনী বাড়ি” বা “চৌধুরী বাড়ি।”

কিন্তু সেই প্রাসাদের প্রতিটি ইটের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অজানা ইতিহাস—ঘাম, অশ্রু, অভাব, নিঃসঙ্গতা আর বেদনার কাহিনি। কেউ বাবা-মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়েছে মাসখানেক পর, কেউ শেষ দেখা ছাড়াই হারিয়েছে আপনজনকে। বিদেশের আলোয় তাদের জীবন আলোকিত হলেও, বুকের গভীরে ছিল অন্ধকারের ভার।

সাফল্যের প্রতিটি গল্পেরই এক অদৃশ্য ছায়া থাকে। বিলাতের আলোয় যারা ঝলমল করছে, তাদের পূর্বপুরুষের বুকের ভেতর ছিল নিঃসঙ্গতার ভার, দেশপ্রেমের তৃষ্ণা আর ফেলে আসা মাটির গন্ধের টান। তারা গড়েছিল সম্পদ, কিন্তু হারিয়েছিল সম্পর্ক, আত্মীয়তা আর নিজের ভিতরের মানুষটাকে।

আজ সেই ত্যাগের ইতিহাসের বিপরীতে জন্ম নিয়েছে এক নতুন প্রবণতা—‘বিলাত ম্যানিয়া’।
এ প্রজন্মের অনেক কিশোর-কিশোরী জন্মের পর থেকেই একটাই স্বপ্ন দেখে—“যেভাবেই হোক বিলাতে যেতে হবে।” তাদের চোখে বিলাত মানে সুখ, বিলাস আর উৎসবমুখর জীবন। তারা ভাবে, সেখানেই আছে মুক্তি, সেখানেই জীবন সুন্দর।

কিন্তু তারা ভুলে যায়—যে বিলাত একদিন তাদের পূর্বপুরুষের ত্যাগ, ঘাম আর নিঃসঙ্গতায় গড়া ছিল, সেই বিলাত আজ আর আগের মতো রঙিন নয়। সময় বদলেছে, বাস্তবতা বদলেছে। সেখানে আছে প্রতিযোগিতা, মানসিক চাপ, নিঃসঙ্গতা আর আত্মপরিচয়ের লড়াই।

তবুও ‘বিলাত ম্যানিয়া’র মোহ আজও অটুট। কেউ ভিসার আশায় প্রতারিত হচ্ছে, কেউ অবাস্তব স্বপ্নে ভেঙে ফেলছে জীবনের ভিত্তি। অনেক তরুণ-তরুণী জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য ভুলে গিয়ে, ভালোবাসা ও মূল্যবোধের জায়গায় বসিয়েছে “বিলাত যাওয়ার সুযোগ”-এর হিসাব।

কেউ বয়সের পার্থক্য ভুলে সম্পর্ক করছে, কেউ ভিসা আর টিকিটের আশায় মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে জড়িয়ে পড়ে প্রতারিত হচ্ছে। এই ম্যানিয়ার পেছনে ছুটে চলা স্বপ্নের ভেতর তারা হারিয়ে ফেলছে তাদের জীবনযৌবনের স্বাদ, সম্পর্কের উষ্ণতা-মায়া আর আত্মমর্যাদার সৌন্দর্য।

জীবনে টাকা-পয়সা, প্রাসাদ, গাড়ি—এসব প্রয়োজনীয়, কিন্তু যথেষ্ট নয়।
একটা ঘর শুধু দেয়ালের ইটে নয়—গড়ে ওঠে ভালোবাসা, সম্পর্ক, সততা আর মাটির গন্ধে।
আর সেই মাটিই আমাদের শেখায়—
যেখানে ভালোবাসা নেই, যেখানে মানবিকতা নেই—সেখানেও বিলাত ফিকে।

পোস্ট শেয়ার করুন

বিলাত ম্যানিয়া

আপডেটের সময় : ০৪:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ নভেম্বর ২০২৫

বিলাত ম্যানিয়া

বাংলাদেশের প্রাচীনতম জনপদ সিলেট—সবুজে ঘেরা, ইতিহাসে ভরা। অথচ এ জেলার কিছু গ্রাম আজ যেন “ছোট্ট লন্ডন”। কারণ, এখানকার বহু পরিবারই এখন বিলাতে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। কিন্তু এই লন্ডনী জৌলুসের শিকড়টা যে কত গভীরে রক্ত-ঘামে মিশে আছে, তা আজকের প্রজন্ম জানে না, বোঝেও না।

গল্পটা শুরু প্রায় সত্তর–আশি বছর আগে। তখন আকাশে উড়োজাহাজ ছিল বিরল, হাতে ছিল না রঙিন পাসপোর্ট। বিলাত পাড়ি দিতে লাগত না আইইএলটিএস, ব্যাংক স্টেটমেন্ট বা স্পোকেন ইংলিশ। ছিল কেবল সাহস, চোখে এক মুঠো স্বপ্ন, আর হাতে সাদা কাগজে একটি টিপস—যেটাই ছিল তাদের “বিলাত যাত্রার ভিসা।”

সেই সময়ের দরিদ্র গ্রামবাংলার কিছু স্বপ্নবিলাসী তরুণ একটুকরো ভালো জীবনের আশায় বুকভরা সাহস নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিল অনিশ্চিত যাত্রায়। জাহাজে চড়ে, অচেনা পথ ধরে তারা ছুটে গেছে দূরদেশ বিলাতের পথে। তাদের না ছিল পুঁজি, না ছিল পৃষ্ঠপোষকতা, না ছিল আত্মীয়তার ভরসা। তবু তারা হাল ছাড়েনি। কারণ, তাদের ছিল একটাই সম্পদ—স্বপ্ন দেখার সাহস।

ভাগ্য শেষমেশ তাদের নিরাশ করেনি। কারখানায়, রেস্তোরাঁয়, পার্কে, ফুটপাতে, ডকের অন্ধকারে, নিঃসঙ্গতার দীর্ঘ রাতে তারা অমানুষিক পরিশ্রমে তিল তিল করে গড়ে তুলেছিল নিজের ভাগ্য। আজ তাদের বংশধরেরা পূর্বপুরুষের পরিশ্রমে গড়া রাজপ্রাসাদসম বাড়িতে বাস করে, ঝলমলে গাড়িতে চড়ে, বিদেশি পোশাকে ঘোরে। গ্রামের মানুষ সেসব বাড়িকে ডাকে—“লন্ডনী বাড়ি” বা “চৌধুরী বাড়ি।”

কিন্তু সেই প্রাসাদের প্রতিটি ইটের ভেতরে লুকিয়ে আছে এক অজানা ইতিহাস—ঘাম, অশ্রু, অভাব, নিঃসঙ্গতা আর বেদনার কাহিনি। কেউ বাবা-মায়ের মৃত্যুসংবাদ পেয়েছে মাসখানেক পর, কেউ শেষ দেখা ছাড়াই হারিয়েছে আপনজনকে। বিদেশের আলোয় তাদের জীবন আলোকিত হলেও, বুকের গভীরে ছিল অন্ধকারের ভার।

সাফল্যের প্রতিটি গল্পেরই এক অদৃশ্য ছায়া থাকে। বিলাতের আলোয় যারা ঝলমল করছে, তাদের পূর্বপুরুষের বুকের ভেতর ছিল নিঃসঙ্গতার ভার, দেশপ্রেমের তৃষ্ণা আর ফেলে আসা মাটির গন্ধের টান। তারা গড়েছিল সম্পদ, কিন্তু হারিয়েছিল সম্পর্ক, আত্মীয়তা আর নিজের ভিতরের মানুষটাকে।

আজ সেই ত্যাগের ইতিহাসের বিপরীতে জন্ম নিয়েছে এক নতুন প্রবণতা—‘বিলাত ম্যানিয়া’।
এ প্রজন্মের অনেক কিশোর-কিশোরী জন্মের পর থেকেই একটাই স্বপ্ন দেখে—“যেভাবেই হোক বিলাতে যেতে হবে।” তাদের চোখে বিলাত মানে সুখ, বিলাস আর উৎসবমুখর জীবন। তারা ভাবে, সেখানেই আছে মুক্তি, সেখানেই জীবন সুন্দর।

কিন্তু তারা ভুলে যায়—যে বিলাত একদিন তাদের পূর্বপুরুষের ত্যাগ, ঘাম আর নিঃসঙ্গতায় গড়া ছিল, সেই বিলাত আজ আর আগের মতো রঙিন নয়। সময় বদলেছে, বাস্তবতা বদলেছে। সেখানে আছে প্রতিযোগিতা, মানসিক চাপ, নিঃসঙ্গতা আর আত্মপরিচয়ের লড়াই।

তবুও ‘বিলাত ম্যানিয়া’র মোহ আজও অটুট। কেউ ভিসার আশায় প্রতারিত হচ্ছে, কেউ অবাস্তব স্বপ্নে ভেঙে ফেলছে জীবনের ভিত্তি। অনেক তরুণ-তরুণী জীবনের প্রকৃত লক্ষ্য ভুলে গিয়ে, ভালোবাসা ও মূল্যবোধের জায়গায় বসিয়েছে “বিলাত যাওয়ার সুযোগ”-এর হিসাব।

কেউ বয়সের পার্থক্য ভুলে সম্পর্ক করছে, কেউ ভিসা আর টিকিটের আশায় মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে জড়িয়ে পড়ে প্রতারিত হচ্ছে। এই ম্যানিয়ার পেছনে ছুটে চলা স্বপ্নের ভেতর তারা হারিয়ে ফেলছে তাদের জীবনযৌবনের স্বাদ, সম্পর্কের উষ্ণতা-মায়া আর আত্মমর্যাদার সৌন্দর্য।

জীবনে টাকা-পয়সা, প্রাসাদ, গাড়ি—এসব প্রয়োজনীয়, কিন্তু যথেষ্ট নয়।
একটা ঘর শুধু দেয়ালের ইটে নয়—গড়ে ওঠে ভালোবাসা, সম্পর্ক, সততা আর মাটির গন্ধে।
আর সেই মাটিই আমাদের শেখায়—
যেখানে ভালোবাসা নেই, যেখানে মানবিকতা নেই—সেখানেও বিলাত ফিকে।