আপডেট

x


স্বপ্না রানী’র স্বপ্নের জয়; কুড়িগ্রামের প্রথম নারী অটোরিক্সা চালক

মঙ্গলবার, ০৮ জানুয়ারি ২০১৯ | ৬:০৬ অপরাহ্ণ | 1016 বার

স্বপ্না রানী’র স্বপ্নের জয়; কুড়িগ্রামের প্রথম নারী অটোরিক্সা চালক

দেশদিগন্ত নিউজ ডেস্ক:  একজন স্বাভাবিক পুরুষের মতো সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত অনায়াসে অটোরিক্সা চালাচ্ছেন স্বপ্না রাণী। আলোচনা-সমালোচনার মুখেও বন্ধ হয়নি তার অটো চালানো। সাধারণ স্বপ্না রানী’র স্বপ্নের জয়;
কুড়িগ্রামের প্রথম নারী অটোরিক্সা চালক ব্যাপক দৃষ্টি কেড়েছেন স্বপ্না রাণী। তার এমন সাহসীকতা এখন নারীদের জন্য মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে তিনি অটো চালিয়ে সংসার চালালেও স্বপ্ন দেখছেন পিকআপ ভ্যান চালানোর।

কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলার ভিতরবন্দ ইউনিয়নের দিগটারী গ্রামের বাসিন্দা মৃত: বকসী চন্দ্র বর্মণের মেয়ে শ্রী স্বপ্না রাণী। মা সাবিত্রী বর্মণ। পাঁচ ভাই আর তিন বোনের মধ্যে ৬নম্বর স্বপ্না । গত প্রায় ১৭বছর আগে বাল্য বয়সে পাশ্ববর্তি ফুলবাড়ি উপজেলার ভাঙ্গামোড় ইউনিয়নের পাখিরহাট নগরাজপুর গ্রামের রণজিৎ দাসের পুত্র স্বর্ণ কারিগর রতন দাসের সঙ্গে ২৫হাজার টাকা যৌতুকের বিনিময়ে বিয়ে হয়। দু’সন্তানের মধ্যে মেয়ে রাধারাণী (১২) ৫ম শ্রেণীর ছাত্রী এবং ছেলে হৃদয়(৮) ১ম শ্রেণীর ছাত্র। তারা দু’জনেই ভিতরবন্দ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়াশুনা করছে। স্বপ্নার পড়াশুনার ইচ্ছা থাকলেও অভাবের জন্য সেটা আর হয়ে না ওঠায় ৫ম শ্রেণীতেই থেমে থাকতে হয়েছে। স্বাভাবিক ভাবে সংসার চললেও কিছু দিনের মাথায় নেমে আসে যৌতুকের জন্য অত্যাচার। প্রায় সময় অনাহারে-অর্ধহারে থাকতে হতো স্বপ্নাকে। নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি একটি এনজিওতে অভিযোগ করে স্বপ্নার পরিবার। এরপর তিনদিনের ছেলেকে রেখে তার স্বামী তাকে ছেড়ে চলে যান। অভাবের তাড়নায় কয়েকদিন উপোষ থাকার পর বড় ভাই নারায়ণ ও সুবল এনে তাকে নিয়ে আসে বাড়িতে। সেই থেকে নিজের পথ চলা স্বপ্নার। রাজমিস্ত্রি থেকে শ্রমিক এমনকি দিন মজুরের কাজ করতে মাঠ-ঘাটে চষে বেড়িয়েছেন স্বপ্না। শত অভাবে পড়েও স্বপ্না বিপথগামী হয়নি। এরমধ্যে ২০১৫সালে স্বপ্ন প্রকল্পে দেড় বছর দৈনিক ৬ঘন্টা কাজ করে ২শ টাকা মজুরি পেত। প্রকল্প থেকে কাজের পাশাপাশি নারীদের ভাগ্য উন্নয়নে দেয়া হতো বিভিন্ন প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণ শেষে তার সঞ্চয়কৃত ২০হাজার টাকা এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সহযোগিতায় একটি অটোরিক্সা কেনেন তিনি। প্রায় দু’বছর হতে কুড়িগ্রাম-ভূরুঙ্গামারী-রংপুর এবং শহর কিংবা গ্রামের রাস্তায় দিব্বি অটো চালিয়ে বেড়াচ্ছেন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত। কখনও দুর্ঘটনার স্বীকার না হওয়ায় যাত্রীর সংখ্যাও কম নয় তার। মহিলা চালক হওয়ায় নারীরা খুব আগ্রহের সাথে ভিড় জমাচ্ছেন তার গাড়িতে যাতায়াত করার। এই অটোরিক্সা চালিয়ে যা আয় হয় তা দিয়ে ৩জনের সংসার চালাচ্ছেন স্বপ্না রাণী। শত ব্যস্তার মধ্যে সন্তানদের পাশে বাবা না থাকার অভাবটা কখনো বুঝতে দেননি এই উদ্যোমী নারী। সন্তানদের কাছে স্বপ্নাই বাবা-মা। খাওয়া-পড়া থেকে শুরু করে সন্তানদের আবদার মেটাচ্ছেন প্রতিনিয়ত। অটোরিক্সার সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় এখন সে পিকআপ কেনার জন অর্থ জোগাড় করছেন বলে কথা গুলো জানান জেলার প্রথম নারী অটোরিক্সা চালক স্বপ্না রাণী। তিনি আরো বলেন, প্রথম প্রথম একটু সমস্যা হয়েছে। যাত্রী উঠতে চায়নি সহজেই। কিন্তু আস্তে আস্তে সকলের সহযোগিতায় এখন আর এই সমস্যা হয়না। শুরুতে আয় ভালোই ছিল, দৈনিক প্রায় দু’হাজার টাকা হলেও বর্তমানে অটোরিক্সার সংখ্যা বেড়ে গেছে তাই পাঁচশ থেকে আটশ টাকা আয় হয়। আর এ কারণেই চিন্তা আছে পিকভ্যান কেনার।
স্বপ্নার দু’সন্তান রাধারাণী ও হৃদয় জানান, প্রতিদিন মা সকালে উঠে আমাদের জন্য খাবার তৈরি করে। সে নিজে খেয়ে সকাল ৮টার মধ্যেই বেড়িয়ে যায় আসে রাত ৭-৮টার দিকে। আমরাও পড়াশুনা শেষে স্কুলে চলে যাই।
স্বপ্নার বড় ভাই নারায়ণ বলেন, অনেক আশা ছিল ছোট বোনটা বিয়ের পর ভাল থাকবে। কিন্তু তার কপালে সেই সুখ আর তার জোটেনি। স্বামী চলে যাবার পর বাঁচ্চা দুটিকে নিয়ে অসহায় দিন কাটে স্বপ্নার। পড়ে বাধ্য হয়ে নিজ বাড়িতে নিয়ে আসি। এরপর রাজমিস্ত্রি অথবা যখন যে কাজ জুটেছে তখনি সে কাজ করেছে। অটোরিক্সা কেনার পর তার চালানোর কৌশল আর পরিশ্রম করে চলছে এখন পর্যন্ত। পরে নাগেশ্বরীর ইউএনও তাকে একটি ঘর করে দেয় আমার লিখে দেয়া ৩শতক জমিতে। ওখানেই বর্তমানে স্বপ্না পরিশ্রম করে ভালভাবেই জীবনে বাকি দিনগুলো সাহসের সাথে পার করছে। প্রায় সময় স্বপ্নাকে দেখতে অনেক মানুষজন আসে গর্বে তখন বুকটা ভরে যায়।
পাটেশ্বরী যাওয়ার অটোযাত্রী মফিদুল,মজিবর, সহিদুল জানান, প্রথমে একটু অবাক হয়ে ছিলাম তার অটো চালানো দেখে। ভয়ে ভয়ে উঠতাম না তার অটোতে। কিন্তু যখন একজন পুরুষের মতো স্বাভাবিক নিয়মে অটো চালা দেখে বলতে গেলে প্রায় নিয়মিত যাত্রী হয়ে গেছি। পুরুষরা প্রতিযোগিতা গতি তুলে রাস্তায় অটো চালায়। কিন্তু স্বপ্না আপাকে কখনই দেখি নাই গতি তুলতে কিংবা ওভারটেক করতে।
স্বপ্নার প্রতিবেশি শেফালী এবং কৃষ্ণ চন্দ্র বলেন, আমাদের এই ভিতরবন্দ ইউনিয়ন এখন স্বপ্না নামেই পরিচিতি পাচ্ছে বেশি। স্বপ্না অটোরিক্সা চালালেও লোকাল ভাড়া কম খাটে। বেশির ভাগ রোগী নিয়ে রংপুর মেডিকেল কলেজ কিংবা বেসরকারি ক্লিনিক গুলোতে যায়।
ইউএনডিপি স্বপ্ন প্রকল্পের জেলা ব্যবস্থাপক আহমাদুল কবীর আকন বলেন, স্বপ্না তার কঠোর পরিশ্রম দিয়ে জেলা এবং জেলার বাইরেও পরিচিতি লাভ করেছে। স্বপ্না এখন এই দরিদ্র জেলার নারীদের জন্য রোল মডেল হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে দেখিয়েছে ইচ্ছা শক্তি থাকলেও নারীরাও পুরুষের মতো সমান তালে কাজ করতে পারে।



মন্তব্য করতে পারেন...

comments


deshdiganto.com © 2019 কপিরাইট এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত

design and development by : http://webnewsdesign.com