আপডেট

x


বিশ্ব বাজারে অর্থনৈতিক দূরাবস্থা; সমাধান কোন পথে?

শনিবার, ২৪ ডিসেম্বর ২০২২ | ৮:৫৯ অপরাহ্ণ | 14 বার

বিশ্ব বাজারে অর্থনৈতিক দূরাবস্থা; সমাধান কোন পথে?

দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রার সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য যখন সহনীয় পর্যায়ে থাকে, তখন মানুষের জীবন কাটে স্বস্তিতে। অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য যখন মানুষের আর্থিক সংগতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে পড়ে, তখন জনজীবনে শুরু হয় অশান্তি। বর্তমানে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির ফলে জনজীবন পিষ্ট। এ পরিস্থিতিতে দৈনন্দিন চাহিদা মেটাতে নাভিশ্বাস উঠছে মানুষের। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি আমাদের সামাজিক, জাতীয় ও অর্থনৈতিক জীবনে এক বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বর্তমানে দেশের বাজারে অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে। চাল, তেল, চিনি, আটা, শাকসবজি, ডিম, মুরগিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দাম কয়েক দফা বেড়েছে। পিছিয়ে নেই মাছ ব্যবসায়ীরাও। এই মূল্যবৃদ্ধি সেসব সীমিত আয়ের মানুষের ওপর নতুন আঘাত, যারা ইতোমধ্যে করোনাভাইরাসের কারণে মূল্যস্ফীতিতে নাকাল। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব বেশি পড়েছে অতিদরিদ্র, নিম্ন ও নিম্নমধ্যম আয়ের মানুষের ওপর। বাজারে অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা বৃদ্ধির বিষয়টি উদ্বেগজনক। জাতীয় ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে দাম ক্রমাগত বাড়ছে ।



দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যহীনতা। চাহিদা তীব্র ও সরবরাহ সীমাবদ্ধ হলে পণ্যের জন্য ক্রেতার ভিড় বেড়ে যায়। পণ্য সংগ্রহে শুরু হয় প্রতিযোগিতা। ফলে অনিবার্যভাবে মূল্যবৃদ্ধি ঘটে । আমাদের দেশে জনসংখ্যা ক্রমাগত বেড়েই চলেছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে মানুষ কৃষি জমিতে ঘরবাড়ি নির্মাণ করছে। ফলে উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে এবং জনগণের চাহিদা অনুযায়ী, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের প্রাপ্যতা নিশ্চিত হচ্ছে না। ফলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। এছাড়া দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যান্য কারণগুলো নিম্নরুপ —

রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ: বর্তমানে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ। রাশিয়া-ইউক্রেন বিশ্বের বৃহত্তম খাদ্য উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারী দেশ। এদের মধ্যে চলমান যুদ্ধে সরাসরি প্রভাব পড়েছে খাদ্য উৎপাদন ও এর সরবরাহ ব্যবস্থায়। যুদ্ধের কারণে অস্থিতিশীল হয়ে পড়েছে জ্বালানিসহ নিত্যপণ্যের বাজার।

জ্বালানির দাম বৃদ্ধি: দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির অন্যতম একটি কারণ জ্বালানির দাম বৃদ্ধি। বাংলাদেশের মোট জ্বালানি চাহিদার বেশিরভাগ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়ে থাকে । জ্বালানির দামবৃদ্ধির ফলে পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পায়, যা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে। পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির ফলে শিল্পজাত দ্রব্য সামগ্রী বাজারে পাঠানো বা কাঁচামাল কারখানায় আনার ব্যয় বৃদ্ধি পায়। এ কারণে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক ।

কর আরোপ: দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির আরেকটি কারণ সরকার কর্তৃক করারোপ। আর্থিক সংকট কাটানোর জন্য আমদানিকৃত ও দেশীয় উৎপাদিত পণ্যের ওপর কর আরোপ করা হয়। ফলে দ্রব্যমূল্যের ওপর প্রভাব পড়ে।

বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি: আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির প্রভাব অভ্যন্তরীণ বাজারেও পড়ে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি বর্তমানে একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। যুদ্ধ, সংঘাত, জ্বালানি সংকট, মুদ্রার অবমূল্যায়নসহ বিভিন্ন কারণে বিশ্ববাজারে পণ্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। বাংলাদেশে ফল, খাদ্য দ্রব্য, যন্ত্রপাতি থেকে শুরু করে বেশিরভাগ পণ্য বিভিন্ন দেশ থেকে আমদানি করা হয়ে থাকে। এ অবস্থায় আমাদের দেশে আমদানিকৃত পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।

উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি: উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির সাথে সাথে যেকোনো দ্রব্যের বিক্রয়মূল্য বৃদ্ধি পায়। একটি দ্রব্যের উৎপাদন বিভিন্ন অংশের মিলিত সমাহার। যেমন কৃষিজাত দ্রব্য উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত থাকে – বীজ, সার, কীটনাশক, যন্ত্রপাতির ব্যবহার, সেচ ব্যবস্থা এবং শ্রমিকের মজুরি। এই বিষয়গুলি এক বা একাধিক অংশের মূল্য বৃদ্ধির সাথে সাথে দ্রব্যের বিক্রয়মূল্য বৃদ্ধি পেতে থাকে।

অসাধু ব্যবসায়ীদের কারসাজি ও চোরাচালানি: কৃষি ও শিল্প কারখানাগুলোর উৎপাদনে সীমাবদ্ধতা এবং বৈদেশিক মুদ্রার অভাবে কোনো দ্রব্য চাহিদা অনুযায়ী আমদানি করা সম্ভব হয়না। ফলে মজুতদার ও দুর্নীতিপরায়ণ ব্যবসায়ীরা এর সুযোগ গ্রহণ করে। তারা সিন্ডিকেট করে জিনিসের কৃত্রিম অভাব সৃষ্টি করে, ফলে দ্রব্যের মূল্য অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পায়।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ: বাংলাদেশ একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ দেশ। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এদেশে প্রতিবছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, খরা, নদীভাঙন, অতিবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, বিভিন্ন মহামারী ইত্যাদি দুর্যোগ দেখা দেয়। এতে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তাই উৎপাদন স্বল্পতার কারণে স্বাভাবিকভাবে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পায়।

আমাদের করণীয়

নানা কারণে আমাদের দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য বেড়েই চলছে। অনেক দ্রব্যের দাম দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে গেছে। তাই যত দ্রুত সম্ভব দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি নিয়ন্ত্রণে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে চাহিদা অনুযায়ী পণ্যের জোগান নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের কৃষিনির্ভর সমাজব্যবস্থায় কৃষির উৎপাদন বাড়াতে হবে।

এক্ষেত্রে কৃষি জমি থেকে সর্বোত্তম ফসল লাভের জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ, উন্নত বীজ, প্রচুর সার ও সেচ ব্যবস্থার সমন্বয় করতে হবে। দেশের সকল অঞ্চলে প্রয়োজনীয় দ্রব্যাদি সমবণ্টনের মাধ্যমে চাহিদা নিবারণের ব্যবস্থা করতে হবে। মজুতদার, চোরাকারবারি ও ফটকাবাজদের জন্য আইন প্রণয়ন ও তা যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে।

কৃষি ভর্তুকি বৃদ্ধি করে কৃষকদের উৎপাদনে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। উৎপাদন বাড়লে বাজারে পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল হবে। একচেটিয়া বাজারকে নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্যে প্রতিযোগিতামূলক বাজার সৃষ্টি করতে হবে। সর্বোপরি সামগ্রিক বাজার ব্যবস্থাপনার ওপর সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণ থাকতে হবে এবং কেউ যেন হঠকারী সিদ্ধান্ত দিয়ে দ্রব্যের মূল্যকে প্রভাবিত করতে না পারে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে। শুধু সরকার নয়, সাধারণ মানুষকেও দ্রব্যমূল্য সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধের জন্য সামাজিকভাবে আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।

– মুহাম্মাদ মাহদী হাসান
লেখক, সংগঠক ও মানবাধিকারকর্মী

মন্তব্য করতে পারেন...

comments


deshdiganto.com © 2019 কপিরাইট এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত

design and development by : http://webnewsdesign.com