বিলেতের পথে পথে (২০তম )

মঙ্গলবার, ২৪ অক্টোবর ২০১৭ | ১১:৪৫ অপরাহ্ণ | 537 বার

বিলেতের পথে পথে (২০তম )

রাতেই স্ত্রীর সঙ্গে পরামর্শ করে পরের দিন সকালে ১০/১২জনের জন্য বিরিয়ানি স্যালাড আর চিকেন রোস্ট এর ব্যবস্থা করে ঘুমিয়ে পরলাম, পর দিন একটু দেরিতে ঘুম থেকে উঠেই বেড়িয়ে পড়লাম কিছু জরুরি কাজ ছিল, সকাল সকাল এগুলি শেষ করে যাতে জুম্মার নামাজ পড়ে খাবার খেয়ে বের হয়ে যাবো,জুম্মা শেষ হতে প্রায় দুটো বেজে গেলো,বাসায় ফিরে রেডি হয়ে বের হতে ২টা ৩০ মিনিট, গিন্নি আর আমার মেয়ে আমার সহযাত্রী, অঙ্গারের পথে ছোটলাম, গাড়িতে উঠেই রিং করলাম নীলাকে ও যেন আমার ফোনের অপেক্ষায় ছিল,আংকেল কখন আসছেন,বললাম ট্রাফিক না হলে সোয়া তিনটায় পৌঁছে যাবো ইনশাআল্লাহ, আমার মেয়ে গাড়িতে উঠলেই অভিযোগ করে তোমার গাড়ি নোংরা, আমি আর উঠবোনা, আমি প্রতিবারই ওকে বলি আগামী বার যখন উঠবে দেখবে পরিষ্কার, কিন্তু রাখতে পারিনা, কেন পারিনা সেটা আর নাইবা বললাম, সারা জীবন অগোছালো মানুষ কি করে এখন খুব গোছিয়ে চলবো,যেভাবে ধাতস্থ হয়ে গিয়েছি সেভাবেই চলি,এলোমেলো ভাবনা চিন্তায় অঙ্গারে পৌঁছে গেলাম ঘড়িতে বাজে ৩টা পাচঁ আমার অনুমানের চেয়েও দশ মিনিট পূর্বে পৌঁছে গেলাম,নীলা আর ওঁর মায়ের সঙ্গে আমার স্ত্রী আর মেয়ের পরিচয় পর্ব শেষ করলাম, খাবারের পাত্রগুলি ডাইনিং টেবিলে রেখে দিয়ে নীলাকে বললাম “মা” ঝটপট একটু ঠান্ডা পানীয় খাওয়াও হটাৎ খুব তৃষ্ণা পেয়েছে,বসার ঘরে একই ভাবে তাহমিনা হইল চেয়ারে বসে আছে আমার মেয়েকে বাম হাত দিয়ে ধরে রেখেছে আর ইশারায় আমাকে দেখিয়ে আমার স্ত্রীকে বলছে আমার চেহারা আমার মেয়ে পেয়েছে,অনেকেই বলে আমিও আমার বাবার চেহারা পেয়েছি,তবে বয়েসের ধাপে ধাপে মানুষ ও ক্রম বিবর্তনশীল শুধু যে চেহারা সুরতে তা কিন্তু নয়, স্বভাবে চলনে বলনে বদলে যাওয়াটাই যেন মানব চরিত্র, এর বাহিরে যারা তারা আমাদের আইডল এবং অবশ্যই ব্যতিক্রম, আমার স্ত্রীর স্বভাব হলো অসুস্থ কাউকে দেখলেই সেবা শুশ্রুষায় লেগে যাওয়া নিমিষেই নীলাকে ডেকে চিরুনি মাথায় মাখার সুবাসিত তৈল নিয়ে এসে তাহমিনা কে যত্নে চুল আঁচড়িয়ে দেয়া শুরু করলো, আমি বললাম তুমি নীলার সঙ্গে থাকো তাহমিনাকে দেখভাল করো ওদের বাড়ির ভিতরে,ছোট হরিণ আছে সাদা কবুতর সাদা বিড়াল তাহমিনার পোষা আমার মেয়েকে দেখাও আরো কিছু গেস্ট নিয়ে আসছি, তাহমিনা খুশি হবে একজন এক সময় তাহমিনার খুবই ঘনিষ্ঠ ছিল,পৌনে চারটায় রওয়ানা হলাম ডেভডেন স্টেশন এর উদ্দেশ্যে,ডেভডেন স্টেশন টি লাউটন এর খুবই কাছে তাড়াতাড়ি পৌঁছে গেলাম, স্টেশন এর সামনে গাড়ি পার্ক করে বসে আছি চারটা দশে স্টেশন থেকে একসঙ্গে বের হলো ইউহোনো, কাজল, রিয়া, তিন জনকে উঠিয়ে রওয়ানা হলাম আবার অংগারের দিকে, যথারীতি পৌঁছেও গেলাম আজকের দিনটাতে রাস্তার ভাগ্য আমার ভালোই বলতে হবে প্রতিদিন এই রাস্তা দিয়ে আসি যাই প্রায়ই ট্রাফিকের মধ্যে পরে লেট্ হয় কিন্তু আজ লেট্ লতিফ না হয়ে ফার্স্ট লতিফ হয়ে গেলাম ,কাজল কে ইচ্ছে করেই বলিনি কার বাসায় নিয়ে যাচ্ছি, কাজল আর তাহমিনা খুবই কাছের বান্ধবী ছিল ছোটবেলা এক সঙ্গে রেল কলোনির লাল ইট বিছানো রাস্তায় হেটে হেটে শেফালী ফুল কুঁড়িয়ে দুই জন শৈশব পার করে কৈশোরে পরেই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, তাহমিনার বাবা বদলি হয়ে চলে যান কুমিল্লা এদের সম্পর্ক ও বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়, কিন্তু বিদায় নিয়ে যাবার দিন সেকি কান্না দুই জন কেউ কাউকে ছাড়ে না গলা জড়িয়ে ধরে অবিরাম অশ্রুপাত এতো বছর পরও আমার মন থেকে মুছে যায়নি সেই কান্নার দৃশ্য,আমি সেই ছোটবেলা থেকেই বাউন্ডলে, ট্রেনে উঠে কুমিল্লা গিয়ে তাহমিনাদের বাসায় দুই রাত কাটিয়ে আবার বাড়িতে চলে আসতাম এভাবেই কখনো ফেনী,কখন চাঁদপুর, ব্রাম্মন বাড়ীয়া ঢাকা বন্ধু বান্ধব দের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হইনি,আরো একটি সুন্দর ব্যবস্থা আমাদের কে সেই সময় সংযুক্ত রাখতো সেটা “চিঠি” চিঠি লেখাটিও একটি বিশাল আর্ট, যা আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই,সেই যুগে চিটির মাধ্যমে আমরা অনেক দূরে থেকেও সংযুক্ত থাকতে পারতাম, ডাক পিওনের অপেক্ষায় সপ্তাহ কেটে যেত, আমার আবার চিঠি বেশি দিন না পেলে অপেক্ষা করতে মন চাইতোনা সোজা ট্রেনে উঠে এক চক্কর দিয়ে আসতাম,এই যে ঘোরে ঘোরে সবার সঙ্গে সম্পর্ক রাখতাম তা আজো আমাকে আমাদের কে এতো বছর পরও মনেও হয় সংযুক্ত করে রেখেছে, কোন না কোনো ভাবে সবার সঙ্গেই এক অকৃত্রিম স্নেহের মায়ার বন্ধনে যেন জড়িয়ে আছি,এটাই বা কম কিসে? কাজল দের কে নিয়ে তাহমিনার বাসায় প্রবেশ করলাম, আমার স্ত্রী পরিচয় করিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতেই হাত তোলে নিষেধ করলাম, কাজল কে বললাম তোর কুলাউড়ার জীবনের সবচেয়ে কষ্ঠের একটি স্মৃতি মনে করতো, যেদিন তুই খুবই কষ্ট পেয়েছিলি,সে অনেক্ষন চিন্তা করে আমাকে দুইবার গালি দিয়ে বললো আমার প্রিয় বান্ধবী তাহমিনা যেদিন ট্রেনে উঠে ওর বাবা বদলি হবার পর কুমিল্লা চলে যায়, স্টেশনে আমরা সবাই ছিলাম কিন্তু সব চেয়ে বেশি সেদিন কাজল কেঁদেছিলো ,তো এখন যদি এই বয়েসে তাহমিনা কে বের করে দেই তাহলে তোর সব জমানো টাকা আমাকে দিয়ে দিবি তো? ও আমাকে উত্তরে বললো যা দিয়ে দেব,বললাম পাক্কা সেও ছোটবেলার স্টাইলে আমার হাতে থাপ্পড় দিয়ে বললো পাক্কা, ওর সামনে বসা আমার স্ত্রীর হাতে ইতি মধ্যে তাহমিনার কাপড় পরিবর্তিত হয়েছে চুল খুব সুন্দর পরিপাটি করে আঁচড়িয়ে তাহমিনার আসল চেহারা যেন কিছুটা হলেও ফোটেছে,ওকে দেখিয়ে বললাম এই আমাদের তাহমিনা,কাজল উঠে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো খুব কাঁদলো দুই জন্ই আমি দেখলাম ইমোশনাল হয়ে যাবো বাহিরে বের হয়ে ওর ঘরের পিছনের অংশে গিয়ে দেখি আমার মেয়ে আর নীলা হরিণ কে ঘাস খাওয়াচ্ছে,বিড়াল দুটি টুকটুক করে দুধ খাচ্ছে কবুতর গুলি ও গম খাচ্ছে এক স্বর্গীয় আবহের মধ্যে আমাদের সন্তান,মুহূর্তেই চিন্তা করলাম কথা টা কি ভুল ?? ভালো লাগলো দুই জন খুব কাছাকাছি চলে এসেছে, পরিকল্পনার কথা আমার মেয়ে বলছে আপু নেক্সট সামারে তোমার এই গার্ডেনে আমি ও মা এসে সবজি চাষ করবো, আমার বাবা অলস উনি এসব করতে পারবেন না, আসলেই আমি অনেক কিছুই পারিনা আবার অনেক কিছুই হয়তো পারি,এই যে পারা না পারা নিয়েই আমার আমি,(চলবে),

মন্তব্য করতে পারেন...

comments

১৬টি বছর খুব সুন্দর ছিলো’ চিরকুটে আত্মহননকারী কলেজ ছাত্রী

deshdiganto.com © 2019 কপিরাইট এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত

design and development by : TAP.Com