আপডেট

x


এবার ঢাকা ছাড়ার পর ভোগান্তি শুরু, তবুও চাই প্রিয়জনের সান্নিধ্য

শনিবার, ২৪ জুন ২০১৭ | ৬:০০ অপরাহ্ণ | 1081 বার

এবার ঢাকা ছাড়ার পর ভোগান্তি শুরু, তবুও চাই প্রিয়জনের সান্নিধ্য

রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে গতকাল বৃহস্পতিবারই ছিল ঈদ-পূর্ববর্তী শেষ কর্মদিবস। তাই অফিস ছুটি শেষে বাসায় ফিরেই অনেকে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রওনা দেয় বাড়ির পথে। রেলস্টেশন, বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনালমুখী মানুষের ঢল শুরু হয়ে যায় বিকেলের মধ্যেই। রাজধানীর রাস্তাঘাটে যানবাহন ও মানুষের বাড়তি চাপ দেখা যায়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গতকাল সন্ধ্যার পর পর্যন্ত প্রতিটি বাস, ট্রেন ও লঞ্চ তাদের নির্ধারিত সময়েই গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, ঈদ উপলক্ষে আজ ও আগামীকাল বাড়িমুখী যাত্রীদের মূল চাপ দেখা যাবে।

তবে ঢাকা থেকে ঠিক সময়ে বের হতে পারলেও গতকাল সড়কপথের যাত্রীদের মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে যানজট ও ধীরগতির কারণে ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। সকাল থেকে ঢাকা-ময়মনসিংহ ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহনগুলো থেমে থেমে চলতে দেখা গেছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের টঙ্গী থেকে গাজীপুর পর্যন্ত ১২ কিলোমিটার সড়কে সকাল থেকে মাঝেমধ্যেই যানজট দেখা গেছে। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কুমিল্লার দাউদকান্দির মেঘনা-গোমতী সেতুর টোল প্লাজা থেকে মেঘনা সেতু পর্যন্ত বুধবার রাত থেকে গতকাল বিকেল পর্যন্ত থেমে থেমে যানজট লেগেই ছিল। এই মহাসড়কে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া অংশের মেঘনা সেতু থেকে বাউশিয়া পর্যন্ত ১৩ কিলোমিটারজুড়ে যানজট ছিল দিনভর। সংশ্লিষ্টরা জানায়, ঈদ যাত্রায় শেষের দিকে ভোগান্তি হবে- এমন ভেবে যাত্রীরা আগেভাগেই রওনা দিয়েছে। একসঙ্গে বিপুলসংখ্যক যাত্রী পথে নামায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে।



বাস-ট্রেন ছাড়ছে ঠিক সময়েই : মহাখালীর আন্ত জেলা বাস টার্মিনালে গতকাল বিকেল সাড়ে ৫টায় কথা হয় বগুড়াগামী একতা পরিবহনের যাত্রী শফিক আহমেদের সঙ্গে। পরিবারের আরো চার সদস্য নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন বাসের জন্য। বললেন, ‘আধাঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছি। এর মধ্যে একতা পরিবহন ছাড়াও অন্যান্য পরিবহনের গাড়িগুলো সময়মতো ছেড়ে যাচ্ছে। যাত্রীদের তেমন একটা অসুবিধা হচ্ছে না। বাইপাইল, চন্দ্রা, কালিয়াকৈর ও মির্জাপুর এলাকায় যানজট না হলে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারব।’

মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে ময়মনসিংহ, জামালপুর, নেত্রকোনা, টাঙ্গাইল, শেরপুর ও সিলেটের বাস যাতায়াত করে। উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায় চলাচল করে শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের ম্যানেজার তুহিনের সঙ্গে রাত ৮টা কথা হয়। তুহিন বললেন, ‘সকাল ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত আমাদের ৩৯টি গাড়ি উত্তরবঙ্গের উদ্দেশে ছাড়ে। রাত ৮টা পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ে গাড়ি ছাড়তে পেরেছি আমরা। প্রশাসন ও পুলিশের লোকজন সচেতনভাবে দায়িত্ব পালন করায় এখন পর্যন্ত যানজট হয়নি। রাতের দিকে কিছুটা যানজট থাকতে পারে। সময়মতো বাস ছাড়তে পারলে যাত্রীদের ভোগানি্তও কম হবে।’

রাজধানীর গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে উত্তরবঙ্গের লালমনিরহাট, দিনাজপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, রাজশাহীর পথে চলাচলকারী সবচেয়ে বড় বাস সার্ভিস নাবিল পরিবহনের কাউন্টার ব্যবস্থাপক আব্দুল আউয়াল জানান, এ বছর তাঁদের ৭৫ শতাংশ টিকিট অনলাইনে বিক্রি হয়েছে। তাই কাউন্টারের সামনে ঘরমুখী মানুষের চাপ তেমন বোঝা যাচ্ছে না।

দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কিছু জেলা ও উত্তরবঙ্গের পথে চলা হানিফ পরিবহন, আগমনী, শ্যামলী পরিবহন, এসআর পরিবহন, মানিক এক্সপ্রেসেও একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে।

চট্টগ্রাম, সিলেট, বরিশাল ও খুলনা বিভাগের অধিকাংশ জেলার বাস ছাড়ে রাজধানীর সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল থেকে। সেখানেও সকালে যাত্রীদের খুব বেশি চাপ ছিল না বলে জানান সায়েদাবাদ আন্ত জেলা বাস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কালাম। তবে রাতে যাত্রীদের চাপ বাড়তে পারে বলে জানিয়েছেন তিনি। আজ সারা দিনও ঘরমুখো মানুষের চাপ থাকতে পারে জানিয়ে তিনি বলেন, ‘ঈদের ট্রিপ দেওয়ার জন্য গাড়ি সব সায়েদাবাদ চলে আসছে। সকাল থেকে অন্তত ১০০ বাস ছেড়েছে। প্রতিটি বাস তার নির্ধারিত সময়েই টার্মিনাল ত্যাগ করছে।’

কল্যাণপুরে টিআর পরিবহনের কাউন্টার ম্যানেজার মিলন আহমেদ  বলেন, প্রতিবছর রাস্তায় যানজটের কারণে কোনো বাস নির্ধারিত সময়ে টার্মিনাল ছেড়ে যেতে পারে না। এবার গতকাল পর্যন্ত কোনো সমস্যা হয়নি। টার্মিনালে হাজারো যাত্রী দেখা গেলেও সবাই নির্ধারিত সময়ের বাসেই রওনা করছেন।

গতকাল কমলাপুর রেলস্টেশনে যাত্রীর চাপ ছিল চোখে পড়ার মতো। আগের দিন ট্রেনের সূচিতে গড়বড় দেখা গেলেও গতকাল সকাল থেকে ট্রেনগুলো নির্ধারিত সময়েই গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে যাচ্ছে বলে জানান স্টেশন ম্যানেজার সিতাংশু চক্রবর্তী। সর্বশেষ তাঁর সঙ্গে কথা হয় গতকাল রাত ৮টায়। বলেন, ‘সকাল থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রায় ৪০টি ট্রেন কমলাপুর ছেড়ে গেছে। সূচি মোটামুটি ঠিকই আছে। পরের ট্রেনগুলোও নির্ধারিত সময়ে ছেড়ে যাবে বলে আশা করছি।’

প্রতিটি ট্রেন ছেড়ে যাওয়ার সময় লিখে রাখছেন কমলাপুর স্টেশনে দায়িত্বরত আনসার সদস্যরা। আনসার কমান্ডার ইয়ার হোসেন জানান, দিনের প্রথম ট্রেন পারাবত এক্সপ্রেস নির্ধারিত ৬টা ৩৫ মিনিটেই সিলেটের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে। এরপর থেকে প্রতিটি ট্রেন নির্ধারিত সময়ে স্টেশন ছেড়ে গেছে। শুধু রাজশাহীগামী ‘রাজশাহী এক্সপ্রেস’ দুপুর ১২টা ২০ মিনিটের নির্ধারিত সময়ের এক ঘণ্টা পর ছেড়ে গেছে।

রেলওয়ে বিভাগ সূত্রে জানা যায়, এবার ঈদে এক হাজার ৩৩২টি কোচ দিয়ে যাত্রীসেবা দিচ্ছে রেলওয়ে। ঢাকা থেকে ৬০ হাজার এবং চট্টগ্রাম থেকে ১৫ হাজার যাত্রীসহ সারা দেশে প্রতিদিন দুই লাখ ৬৫ হাজার যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা রয়েছে রেলওয়ের। বাস টার্মিনাল, রেলওয়ে স্টেশন ও লঞ্চ টার্মিনালে যাত্রীরা যাতে হয়রানির শিকার না হয়, এ জন্য ঢাকা মহানগর পুলিশ, র‌্যাব ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) সার্বক্ষণিক নিরাপত্তাদল রয়েছে।

সদরঘাটমুখী ঢল নামবে আজ : ‘অ্যাডভেঞ্চার’ নামের দেশে তৈরি দৃষ্টিনন্দন এক লঞ্চের উদ্বোধনী যাত্রা দিয়েই আজ শুক্রবার থেকে শুরু হবে ঢাকা থেকে দঞ্চিণাঞ্চলগামী ঘরমুখী মানুষের ঢল। সকালে ঢাকার সদরঘাট থেকে লঞ্চটি যাত্রা শুরু করবে বরিশালগামী যাত্রী নিয়ে। ক্যাটামেরান পদ্ধতির এ লঞ্চের পর আজ সারা দিনই যাত্রীর চাপ সামাল দিতে আসবে-যাবে বহু লঞ্চ। যাত্রীদের চাপ শুরু হয়ে গেছে গতকাল বিকেল থেকেই। আজ মূল ঢল শুরু হবে।

গতকাল পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক মোড়ে দেখা গেল রিকশা থেকে নেমে মাথায় ব্যাগ নিয়ে ছুটতে শুরু করলেন এক ব্যক্তি। নাম বললেন নিজামউদ্দিন, যাবেন বরিশাল। পেছনে স্ত্রী আর সাত বছরের মেয়ে। তাঁদেরও হাতেও ব্যাগ। হেঁটে কুলাতে পারছেন না তাঁরা। রিকশা ছাড়লেন কেন, জানতে চাইলে নিজামউদ্দিন বললেন, ‘সামনে যেই হারে জ্যাম তাতে মনে হয় এইখান দিয়া টার্মিনাল পর্যন্ত যাইতে রিকশার আরো এক ঘণ্টা লাগব। কিন্তু হাইট্টা গেলে বেশি হইলে লাগব ১০ মিনিট। আগে লঞ্চে উঠতে পারলে জায়গা পাইতে সুবিধা হইব।’

এ পরিবারটির মতো আরো অসংখ্য মানুষকে মাথায় কিংবা হাতে ব্যাগ নিয়ে ছুটতে দেখা যায় সদরঘাটের দিকে। তারাও আগেভাগে লঞ্চে ওঠার তাড়ার কথা জানায়।

পাটুয়াটুলী ফুট ওভারব্রিজের নিচে পুলিশ থামিয়ে দিচ্ছিল কিছু যানবাহন। কিছু কিছু পরিবহন ঘাট পর্যন্ত যেতে পারলেও বেশির ভাগ মানুষই ওইটুকু পথের যানজট এড়াতে হেঁটেই পৌঁছে যায় ঘাটে। তবে যাত্রীদের হুড়োহুড়ি আর উত্কণ্ঠার অনেকটাই কেটে যায় ঘাটে পৌঁছে। গতকাল থেকে ঈদ যাত্রার বিশেষ ব্যবস্থা শুরু হওয়ায় লঞ্চের সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। দূরপাল্লার বেশির ভাগ লঞ্চ কম্পানিই তাদের একাধিক লঞ্চ সিডিউলে রেখেছিল গতকাল। ফলে যাত্রীরা ভাগ হয়ে বিভিন্ন লঞ্চে উঠে পড়ায় তুলনামূলক তেমন চাপ পড়েনি। বরং প্রতিটি লঞ্চই ঈদের সময়ের তুলনায় মনে হয়েছে অনেকটা ফাঁকা। আজ থেকে ঈদের নৌপথের যাত্রীদের চূড়ান্ত ভিড় শুরু হবে বলে জানান লঞ্চের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

ঢাকা-বরিশাল রুটের বিলাসবহুল লঞ্চ সুন্দরবন ১০-এর ব্যবস্থাপক হারুনুর রশিদ বলেন, ‘মনে হয় যাত্রীদের তুলনায় আজ লঞ্চ বেশি হয়ে গেছে। বলতে পারেন এটা ভিড়ের মহড়া। আজ (বৃহস্পতিবার) আমাদের কম্পানির দুটি লঞ্চ একসঙ্গে ছেড়ে যাবে বরিশালের উদ্দেশে, অন্যগুলোরও একই অবস্থা। তেমন ভিড় নেই। কাল ও পরশু (শুক্র ও শনিবার) হবে চূড়ান্ত ভিড়। কোনো কোনো লঞ্চ দিনের বেলায়ও বিভিন্ন সময় ছেড়ে দিতে হবে, সিডিউল রক্ষা করা যাবে না।’

গতকাল সদরঘাট টার্মিনালে গিয়ে দেখা যায়, সুন্দরবনের পাশাপাশি সুরভী, পারাবাত, টিপু, কীর্তনখোলাসহ অন্যান্য লঞ্চ সারি বেঁধে অবস্থান করছে। যাত্রীদের নিরাপত্তায় অন্যবারের চেয়ে এবার আরো সতর্ক পদক্ষেপ দেখা যায় ঘাটে। মাইকে বারবার অতিরিক্ত যাত্রী লঞ্চে না ওঠার জন্য অনুরোধ জানানো হচ্ছে। কোন ঘাটে কোন লঞ্চ তা মাইকে প্রচার করা হচ্ছে যাত্রীদের সুবিধার জন্য। পুলিশের পাশাপাশি র্যাবের সদস্যরাও সতর্ক অবস্থানে দায়িত্ব পালন করছেন ঘাটে। আছে আনসার ও স্কাউটের টিম।
গতকাল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় থেকে এবার ঈদে নৌপথে ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিতকরণে একটি বিশেষ কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। যে কেউ যেকোনো সমস্যায় ওই কন্ট্রোল রুমে যোগাযোগ করতে পারবে। কন্ট্রোল রুমের নম্বর ০১৭১২০৯৯৮৩০/০১৫৫২৪৯৮৯৭৯।

মন্তব্য করতে পারেন...

comments


deshdiganto.com © 2019 কপিরাইট এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত

design and development by : http://webnewsdesign.com