আপডেট

x


উপকূলে তাণ্ডব

বুধবার, ৩১ মে ২০১৭ | ৩:৩৮ অপরাহ্ণ | 1274 বার

উপকূলে তাণ্ডব

ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে লণ্ডভণ্ড উপকূলের জনপদ। ঘর ও গাছ চাপায় মারা গেছে ৯ জন। আহত হয়েছে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি। পূর্ব প্রস্তুতি থাকায় ক্ষয়ক্ষতি কম হয়েছে বলে দাবি করেছেস্থানীয় প্রশাসন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর থেকে উপদ্রুত এলাকায় উদ্ধার ও ত্রাণসহায়তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। আক্রান্ত এলাকার মানুষের পাশে দাঁড়াতে দেশবাসী ও সংশ্লিষ্টদের প্রতিআহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব থেমে যাওয়ার পর আশ্রয়কেন্দ্র থেকে গত ৩০ মেই সাধারণ মানুষ যার যার বাড়িঘরেফিরে যান। সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, উপদ্রুত এলাকার ক্ষয়ক্ষতি নিরুপণ করেই ক্ষতিগ্রস্তদের প্রয়োজনীয় সব সহায়তা দেয়া হবে। প্রতিনিধিদের পাঠানো তথ্য অনুযায়ী কক্সবাজারেগাছ চাপায় চারজনের মৃত্যু হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রে মারা গেছেন একজন। বান্দরবান ও রাঙ্গামাটিতে মারা গেছেন তিনজন। ভোলায় আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার পথে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে।উপকূল এলাকায় শত শত ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে গাছ-পালা।  কক্সবাজারে নিহত ৫ : কক্সবাজারে মোরার আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়েছে উপকূলের জনপদ। জেলার বিভিন্নস্থানে ২০ হাজারের অধিক কাঁচা বাড়িঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। গাছ চাপায় দুইজন ও স্ট্রোকে একজনসহ পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছে কমপক্ষে অর্ধশতাধিক। নিহতরা হলেন-কক্সবাজারের সদর উপজেলার গজারিয়া এলাকার শাহিনা আক্তার (১০), শেকুয়া এলাকার আব্দুল হামিদ (৪০) ও নুনিয়াছড়া এলাকার বদিউল আলমের স্ত্রী মরিয়ম বেগম। মরিয়ম আতঙ্কিতহয়ে স্ট্রোক করে প্রাণ হারান। পৌরমেয়র মাহবুবুর রহমান চৌধুরী জানিয়েছেন, আগে থেকেই শারীরিকভাবে দুর্বল ছিল ওই মহিলা। গত ৩০ মে রাতে বাতাস শুরু হলে ভয়ে তার মৃত্যু হয়।আহতদের মধ্যে ২০ হন কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। বিভিন্ন সড়কে গাছ পড়ে কক্সবাজার চট্টগ্রাম সড়ক ও কক্সবাজার টেকনাফ সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।গত ৩০ মে ভোর ৬টায় টেকনাফ উপকূল দিয়ে অতিক্রম করে ঘূর্ণিঝড়টি। প্রবল ঘূর্ণি বাতাস আর প্রচণ্ড ঝড়ো হাওয়ায় কক্সবাজার, টেকনাফ ও সেন্টমার্টিন অতিক্রম করেছে ভয়ঙ্কর ঘূর্ণিঝড়মোরা। কক্সবাজার উপকূলে ঝড়ের গতিবেগ ৮০ হলেও তা টেকনাফে ১০০ কিলোমিটার ও সেন্টমার্টিনে ১৩৫ কিলোমিটার উপর ঝড়ো হাওয়ায় প্রবাহিত হয়। কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো.আলী হোসেন জানান, ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে। সেন্টমার্টিনের পরে রয়েছে টেকনাফের শাহপরী দ্বীপ, সাবরাং ও বাহারছড়া ইউনিয়নেরএকাংশ, দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার উত্তর ধুরুং, দক্ষিণ ধুরুং, আলী আকবর ডেইল, মহেশখালীর কুতুবজুম, ধলঘাট, মাতারবাড়ী, পেকুয়ার মগনামা, উজানটিয়াসহ উপকূলের আরো কয়েকটিএলাকা। তবে প্রচণ্ড বাতাসের আঘাতে কমবেশি বিভিন্ন এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিশেষ করে কাঁচা ঘরবাড়ি, গাছগাছালি, পানের বরজের ক্ষয়ক্ষতির কথাও জানান তিনি। পেকুয়ারমগনামা, রাজাখালি, উজানটিয়ায় কয়েকশ’ কাঁচা ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত ও চিংড়ি মাছ চাষের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। চকরিয়া বদরখালি, রামপুরায়ও কয়েকশ’ ঘরবাড়ি, মাছ চাষের ক্ষতি হয়েছে।এখানে কয়েক হাজার লোককে আশ্রয় কেন্দ্রে এনে রাখা হয়। মহেশখালীর ধলঘাটা কুতুবজোম, মাতারবাড়ি এ তিনটি ইউনিয়নে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কয়েকশ’ ঘরবাড়ি, পান বরজবিলীন হয়ে গেছে। প্রাণহানি এড়াতে এসব এলাকার প্রায় ৫ হাজার লোককে আশ্রয় কেন্দ্র নিয়ে আসা হয়। উখিয়াতে তেমন কোনো ক্ষয়ক্ষতি হয়নি। তবে সমুদ্র এলাকায় বাড়িঘর ভাঙচুরহয়েছে। শহরের সমিতি পাড়া, কুতুবদিয়া পাড়া, বিমানবন্দর এলাকা ক্ষতি হয়েছে। রাতে লোকজন সরানো হয়েছে। ৫ হাজার লোকের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করা হয়। জেলা প্রশাসকজানান, উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা নিয়ে আমরা প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে চেষ্টা করছি। প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণ করতে কয়েক দিন লাগবে। প্রধানমন্ত্রীরকার্যালয় থেকে শুরু করে সব অফিস আমার সাথে যোগাযোগ করেছে। জানতে চেয়েছে ক্ষতির পরিমাণ। পর্যাপ্ত ত্রাণ দেয়ার কথাও জানানো হয়েছে, যাতে কোনো লোক অনাহারে মারা নাযায়। তিনি আরো জানান, আমরা দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত ছিলাম। জেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রায় তিন লাখ লোক আশ্রয় কেন্দ্রে ছিল। একজনও না খেয়ে থাকেনি। চরপাড়া এলাকারএবাদুল্লাহ (৫৫) জানান, পরিবারের সাত-আটজন নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে গিয়েছিলেন তিনি। নাজিরার টেক এলাকার বাসিন্দা সাদিয়া বেগম জানান, ঝড়ের আঘাতে ঘরবাড়ি ভেঙে গেছে। এখনছোট তিন শিশুসসহ ছয়জনের সংসার, কোথায় থাকব, কিভাবে চলব বুঝতে পারছি না। সেন্টমার্টিনের বিশিষ্ট নাগরিক মুজিবুর রহমান জানান, সেন্টমার্টিনে কাঁচা ঘরবাড়ি, গাছগাছালি সববিধ্বস্ত হয়ে গেছে। এখানে মানুষ দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন।  ঘূর্ণিঝড় মোরার প্রভাবে ঝালকাঠিতে থেমে থেমে হালকা বাতাসসহ মাঝারি আকারের বৃষ্টি হচ্ছে। সব রুটের নৌযান চলাচল বন্ধরয়েছে। এখনো পর্যন্ত পানি বাড়েনি। জেলার কোথাও কোনো ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি। জেলা প্রশাসক মো. হামিদুল হক জানিয়েছেন, জেলার চার উপজেলায় মোট ৪৫টি আশ্রয়ণকেন্দ্রসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সরকারি-বেসরকারি ভবনগুলো মানুষের আশ্রয়ের জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্র এখনো পর্যন্ত প্রায় ৩০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগেরউদ্যোগে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী সমন্বয়ে গঠন করা হয়েছে ৩৭টি মেডিকেল টিম। জরুরি প্রয়োজনের জন্য ত্রাণ বিভাগের উদ্যোগে নগদ টাকা, চাল ও শুকনো খাবার মজুদ রাখা হয়েছে বলেজানিয়েছেন জেলা প্রশাসক, ঝালকাঠি মো. হামিদুল হক। ঝালকাঠি জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলো সার্বক্ষণিকভাবে প্রস্তুত রয়েছে। রাঙ্গামাটিতে নিহত ২: ধেয়ে আসা ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতে রাঙ্গামাটি শহরের পৃথক দুটি স্থানে উপচে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে দুইজন নিহত হয়েছে বলে জানা গেছে। নিহতরা হলো- স্কুলছাত্রী জাহিদাসুলতানা (মাহিমা) (১৪) ও গৃহিণী হাজেরা বেগম (৪৫)। এ দিকে সকাল থেকে শুরু হওয়া মোরার তীব্র আঘাতে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে রাঙ্গামাটির যোগাযোগ ব্যবস্থা। অচল হয়ে গেছেজনজীবন। সড়কের বিভিন্ন স্থানে বসতঘর ও সড়কের উপর উপচে পড়েছে বড় বড় গাছ ও ডালপালা। শহরের আসাম বস্তি এলাকায় ভেঙ্গে পড়া গাছের আঘাতে গুরুতর আহত হন গৃহবধূহাজেরা বেগম (৪৫)। তাকে উদ্ধার করে রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে আসার পথে মারা যান। অপর দিকে শহরের ভেদভেদীস্থ মুসলিম পাড়া এলাকায় গোড়া থেকে মাটি সরে গিয়েউপচে পড়া গাছের নিচে চাপা পড়ে নবম শ্রেণীর স্কুলছাত্রী জাহিদা সুলতানা (মাহিমা) (১৪) মারা যায়। রাঙ্গামাটি জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. মুহাম্মদ শওকত আকবর খানহাসপাতালে দুইটি মৃতদেহ আসার খবর নিশ্চিত করেছেন।   ভোলায় ১ শিশুর মৃত্যু : ভোলার মনপুরা উপজেলার ১নং মনপুরা ইউনিয়নের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন কলাতলী চরের পুরাতনআবাসন বাজার থেকে মনিরবাজার সংলগ্ন মনপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আশ্রয়ণ কেন্দ্রে যাওয়ার পথে মায়ের কোলে থাকা অবস্থায় এক বছরের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টিকলাতলী সিপিপি ইউনিট টিম লিডার মো. নাজিমউদ্দিন নিশ্চিত করেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় মোরা আতঙ্কে আবাসন বাজার থেকে ছালাউদ্দিনের স্ত্রী জরিফা খাতুন ও ১ বছরেরছেলেকে কোলে নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার জন্য রওনা দেন। মনিরবাজার সংলগ্ন মনপুরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার পথে প্রচণ্ড বৃষ্টি ও ঠাণ্ডা বাতাসে শিশুটির ঠাণ্ডালেগে যায়। ঠাণ্ডায় শিশুটি আশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার পথে মারা যায়। এ বিষয়ে কলাতলী চরের ইউনিট টিম লিডার মো. শাহাবউদ্দিন বলেন, আশ্রয়ণকেন্দ্রে প্রায় ৭ শতাধিক পুরুষ-মহিলা আশ্রয়নিয়েছেন। আশ্রয় কেন্দ্রে আসার পথে মায়ের কোলে ওই শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি জানান। ১নং মনপুরা ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আমানতউল্যাহ আলমগীর বলেন, কলাতলীচরেআশ্রয় কেন্দ্রে যাওয়ার সময় মায়ের কোলে ১টি শিশুর মৃত্যু হওয়ার খবর পেয়েছি। তবে খোঁজ নিয়ে জেনেছি শিশুটি আগ থেকে নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ছিল। এ দিকে ঘূর্ণিঝড় মোরার আঘাতেভোলার সর্ব দক্ষিণের চরফ্যাশন উপজেলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে গাছপালা ও বাড়িঘরের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। সেখানকার চর কুকরি মুকরি, ঢালচর, পাতিলা, কছপিয়া, আট কপাট, শেমরাজ ওনুরাবাদ এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে বলে স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। চর কুকরি মুকরি ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাসেম মহাজন জানান, ঘূর্ণি ঝড়ে সেখানে শতাধিক বাড়িঘড় বিধ্বস্ত হয়েছে। ভেঙে ধুমড়ে-মুচড়ে গেছে কয়েক হাজার গাছপালা। সেখানকার ক্ষতিগ্রস্তদের সাহায্য করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে তালিকা করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি। ঢালচরইউপি চেয়ারম্যান আবদুস সালাম জানিয়েছেন সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে প্রাই শতাধিক মাছ ধরার জেলে নৌকা ও ট্রলার এখনো ফিরেনি।  লামায় নিহত ১ : লামায় ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’রআঘাতে তিন সহস্রাধিক বাড়ি ঘর লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে। গাছ পড়ে গুরুতর আহত হয়েছে ২ জন। আহতরা হলো- লামা সদর ইউনিয়নের কামরুল (১) ও রূপসীপাড়া ইউনিয়নের ক্যসিংথোয়াই মার্মা (৪০)। আহতদের লামা হাসপাতালে নিয়ে এলে তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য নৌপথে হাসপাতালে নেয়ার সময় ক্যসিংথোয়াই মার্মা মারা যান। গত৩০ মে ভোর ৬টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব। ১১০ থেকে ১৩৫ কিলোমিটার বেগে লামায় আঘাত হেনেছে ঘূর্ণিঝড় ‘মোরা’। লামা-চকরিয়া রোডের দু’পাশের গাছ পড়েসড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। প্রচুর গাছপালা ভাঙার কারণে অসংখ্য বিদ্যুতের খুঁটি পড়ে গেছে। যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে ৫-১০ দিন লাগতে পারে বলে জানায় লামাবিদ্যুৎ অফিস এবং সড়ক ও জনপদ বিভাগ। প্রচণ্ড বাতাসে লণ্ডভণ্ড হয়ে যাওয়া কাঁচা-পাকা বাড়ির লোকজন এখন খোলা আকাশের নিচে। বেশ কয়েক জায়গায় পাহাড় ধস হলেও কোনোহতাহতের খবর পাওয়া যায়নি। স্থানীয় জনসাধারণকে স্ব-উদ্যোগে রাস্তায় ওপর ভেঙে পড়া গাছপালা অপসারণ করতে দেখা যায়।



মন্তব্য করতে পারেন...

comments


deshdiganto.com © 2019 কপিরাইট এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত

design and development by : http://webnewsdesign.com