ঢাকা , শুক্রবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৪, ৫ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ
আপডেট :
লিসবনে আত্মপ্রকাশ হয় সামাজিক সংগঠন “গোলাপগঞ্জ কমিউনিটি কেয়ারর্স পর্তুগাল “ উচ্ছ্বাস আর আনন্দে বাঙালির প্রাণের উৎসব পহেলা বৈশাখের উদযাপন করেছে পর্তুগাল যথাযথ গাম্ভীর্যের মধ্যে দিয়ে পরিবেশে মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব ঈদুল ফিতর পালন করেছে ভেনিস প্রবাসীরা ভেনিসে বৃহত্তর সিলেট সমিতির আয়োজনে ঈদ পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত এক অসুস্থ প্রজন্ম কে সাথি করে এগুচ্ছি আমরা রিডানডেন্ট ক্লোথিং আর মজুর মামার ‘বিশ্বকাপ’ ইউরোপের সবচেয়ে বড় ঈদুল ফিতরের নামাজ পর্তুগালে অনুষ্ঠিত হয় বর্ণাঢ্য আয়োজনে পর্তুগাল বাংলা প্রেসক্লাবের ইফতার ও দোয়া মাহফিল সম্পন্ন ঈদের কাপড় কিনার জন্য মা’য়ের উপর অভিমান করে মেয়ের আত্মহত্যা লিসবনে বন্ধু মহলের আয়োজনে বিশাল ইফতার ও দোয়া মাহফিল

উঠে এসেছি খাদের কিনারা থেকে

মোঃ আব্দুল বাছিত বাচ্চূ
  • আপডেটের সময় : ১১:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ মে ২০১৯
  • / ৭৭৫ টাইম ভিউ

জমিজমা অনেক ছিলো। ৮ ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন ও কাজের লোক মিলে প্রতিদিন ১২/১৩ জনের খাবারসহ সংসার আর সন্তানদের পড়ার খরচ যোগাতে গিয়ে জমিজমা ৯০ শতাংশই বিক্রি করে দেন। পরিবারে আয় বাড়াতে জমি বিক্রি করে বড়ভাইকে বিদেশে পাঠালেও দীর্ঘ সময় তিনি ছিলেন নিখোঁজ ।

সেই অবস্থায় ১৯৮৫ সালে আব্বার আকস্মিক মৃত্যুর পর আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি ভাগ্যান্বেষনে । বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। কিন্তু পত্রিকা জগতে ছিলাম একধরনের নেশাখোর পাঠক। ইত্তেফাক সাধু ভাষার আর সংবাদ ছিলো চলিত ভাষার দৈনিক কাগজ। পত্রিকা দুটি না পড়লে যেনো পেটের ভাত হজম হতো না। কিন্তু কিনে পড়ার সামর্থ্য নেই। একদিন কাজের ফাকে ক্রেতা/ভোক্তার একটি পত্রিকা নিয়ে পড়া শুরু করি। প্রতিষ্ঠান মালিকের এক আত্মীয় সম্ভবত সেটা সহ্য করতে না পেরে বড় একটা গালি দিলেন। আমি নাকি মুর্খ অশিক্ষিত আবার পত্রিকা পড়তে মন চায়। সেরাতে ঘুমাতে পারছিলাম না। গভীর রাতে সিদ্ধান্ত নেই আবার পড়াশোনা করবো। বাড়িতে এসে পড়াশোনা করার ইচ্ছার কথা জানালেও কেউ দায়িত্ব নেয়নি।আর নিবেই বা কে এতো বিরতির পর। ফিরে গিয়ে অন্যের প্রতিষ্ঠানে কাজের ফাকে পড়াশোনা শুরু করি। আমি নবম শ্রেণী থেকে পড়া বাদ দিয়েছিলাম। বইপত্র দেখে মনে হলো ওই বছরই এসএসসি দিতে পারবো। সিলেট পাইলট স্কুল থেকে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করি।

প্রয়োজনীয় কাগজ দিয়ে সাহায্য করলেন বড়ভাই (চাচাতো) শিক্ষক আমিনুর রহমান রেনু ভাই, নয়াবাজার কে সি হাই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক রতিশ বাবু স্যার আর সিনিয়র শিক্ষক খলিল স্যার। ১৫ দিন পর বোর্ডিং য়ে থেকে টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সব বিষয়ে পাস করি। চলে যাই বিশ্বনাথ থানার খাজান্সিবাড়ি ইউনিয়নে। এক প্রবাসী পরিবারে বাচ্চাদের পড়িয়ে পরে নিজে পড়তে হতো। তিনমাস নিজে নিজে প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেই। শুরু হলো বহু প্রতিক্ষিত এসএসসি পরীক্ষা। প্রতিদিন সকাল ৮ টায় ছাতক থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী লোকাল ট্রেনে খাজানশি থেকে সিলেট শিবগঞ্জ সৈয়দ হাতিম আলী স্কুল কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হতো। ট্রেন থেকে নেমে কিছু পায়ে হেটে আবার কিছু বেবী ট্যাক্সি ডেকে যেতাম। অনেকদিন চা আর গ্রামীন নিম্নমানের ২ পিস বিস্কুট মুখে দিয়েও পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়েছি। আর বাসস্থানে ফিরে যেতাম সুনামগঞ্জগামী বাসে জালালাবাদ এলাকায় নেমে সুরমা পাড়ি দিয়ে বাকি তিন মাইল পায়ে হেটে। দূরের কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে গিয়ে অনেক বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয়েছে। গনিত পরীক্ষার দিন প্রচন্ড কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়লে ভিজে জবুথুবু। হাত চলছিলো না। লিখতে পেরেছি ১১ টার পর। অনেক শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা গরম কাপড় নিয়ে আসলেও আমার তো আর সেখানে কেউ ছিলো না।

৯৩ সালের এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার ফলাফল সম্ভবত প্রকাশিত হয়েছিল জুলাই মাসের শেষ বা আগস্ট মাসের প্রথমদিকে। মোবাইল ফোন ছিলো না। পরেরদিন শমসেরনগর বাজার থেকে ইত্তেফাক পত্রিকা এনে জানলাম আমি প্রথম বিভাগে পাশ করেছি। এখন যেভাবে জিপিএ ৫ আসে তখন এরচেয়ে কম শিক্ষার্থী প্রথম বিভাগে পাশ করতো। পরে মার্ক শিট এনে দেখলাম রোল নম্বর প্রাঃ ৭৯২২২ থাকায় মনে হয় অনেক বিষয়ে ৭৭ নম্বর পেয়েছি। কিন্তু ৩ মার্কের জন্য লেটার মার্ক ভাগ্যে জোটেনি।

প্রাইভেট পরীক্ষার্থীদের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা থেকেই এমনটি হতো বলে শুনেছি। পরে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে ভর্তির মধ্য দিয়ে আবার রেগুলার শিক্ষা জীবন শুরু করি। জীবন সংগ্রামে আছে আরো অনেক উত্থান পতনের কাহিনী। (চলবে)

লেখক:- সাংবাদিক ।
সাবেক সভাপতি, প্রেসক্লাব কুলাউড়া।
চেয়ারম্যান, হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদ।

পোস্ট শেয়ার করুন

উঠে এসেছি খাদের কিনারা থেকে

আপডেটের সময় : ১১:৪২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২ মে ২০১৯

জমিজমা অনেক ছিলো। ৮ ছেলেমেয়ে, আত্মীয়স্বজন ও কাজের লোক মিলে প্রতিদিন ১২/১৩ জনের খাবারসহ সংসার আর সন্তানদের পড়ার খরচ যোগাতে গিয়ে জমিজমা ৯০ শতাংশই বিক্রি করে দেন। পরিবারে আয় বাড়াতে জমি বিক্রি করে বড়ভাইকে বিদেশে পাঠালেও দীর্ঘ সময় তিনি ছিলেন নিখোঁজ ।

সেই অবস্থায় ১৯৮৫ সালে আব্বার আকস্মিক মৃত্যুর পর আমার পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়। বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়ি ভাগ্যান্বেষনে । বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছি। কিন্তু পত্রিকা জগতে ছিলাম একধরনের নেশাখোর পাঠক। ইত্তেফাক সাধু ভাষার আর সংবাদ ছিলো চলিত ভাষার দৈনিক কাগজ। পত্রিকা দুটি না পড়লে যেনো পেটের ভাত হজম হতো না। কিন্তু কিনে পড়ার সামর্থ্য নেই। একদিন কাজের ফাকে ক্রেতা/ভোক্তার একটি পত্রিকা নিয়ে পড়া শুরু করি। প্রতিষ্ঠান মালিকের এক আত্মীয় সম্ভবত সেটা সহ্য করতে না পেরে বড় একটা গালি দিলেন। আমি নাকি মুর্খ অশিক্ষিত আবার পত্রিকা পড়তে মন চায়। সেরাতে ঘুমাতে পারছিলাম না। গভীর রাতে সিদ্ধান্ত নেই আবার পড়াশোনা করবো। বাড়িতে এসে পড়াশোনা করার ইচ্ছার কথা জানালেও কেউ দায়িত্ব নেয়নি।আর নিবেই বা কে এতো বিরতির পর। ফিরে গিয়ে অন্যের প্রতিষ্ঠানে কাজের ফাকে পড়াশোনা শুরু করি। আমি নবম শ্রেণী থেকে পড়া বাদ দিয়েছিলাম। বইপত্র দেখে মনে হলো ওই বছরই এসএসসি দিতে পারবো। সিলেট পাইলট স্কুল থেকে প্রাইভেট পরীক্ষার্থী হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করি।

প্রয়োজনীয় কাগজ দিয়ে সাহায্য করলেন বড়ভাই (চাচাতো) শিক্ষক আমিনুর রহমান রেনু ভাই, নয়াবাজার কে সি হাই স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষক রতিশ বাবু স্যার আর সিনিয়র শিক্ষক খলিল স্যার। ১৫ দিন পর বোর্ডিং য়ে থেকে টেস্ট পরীক্ষায় অংশ নিয়ে সব বিষয়ে পাস করি। চলে যাই বিশ্বনাথ থানার খাজান্সিবাড়ি ইউনিয়নে। এক প্রবাসী পরিবারে বাচ্চাদের পড়িয়ে পরে নিজে পড়তে হতো। তিনমাস নিজে নিজে প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেই। শুরু হলো বহু প্রতিক্ষিত এসএসসি পরীক্ষা। প্রতিদিন সকাল ৮ টায় ছাতক থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী লোকাল ট্রেনে খাজানশি থেকে সিলেট শিবগঞ্জ সৈয়দ হাতিম আলী স্কুল কেন্দ্রে গিয়ে পরীক্ষা দিতে হতো। ট্রেন থেকে নেমে কিছু পায়ে হেটে আবার কিছু বেবী ট্যাক্সি ডেকে যেতাম। অনেকদিন চা আর গ্রামীন নিম্নমানের ২ পিস বিস্কুট মুখে দিয়েও পরীক্ষা কেন্দ্রে গিয়েছি। আর বাসস্থানে ফিরে যেতাম সুনামগঞ্জগামী বাসে জালালাবাদ এলাকায় নেমে সুরমা পাড়ি দিয়ে বাকি তিন মাইল পায়ে হেটে। দূরের কেন্দ্রে পরীক্ষা দিতে গিয়ে অনেক বিড়ম্বনায়ও পড়তে হয়েছে। গনিত পরীক্ষার দিন প্রচন্ড কালবৈশাখী ঝড়ের কবলে পড়লে ভিজে জবুথুবু। হাত চলছিলো না। লিখতে পেরেছি ১১ টার পর। অনেক শিক্ষার্থীর অভিভাবকরা গরম কাপড় নিয়ে আসলেও আমার তো আর সেখানে কেউ ছিলো না।

৯৩ সালের এপ্রিল মাসে অনুষ্ঠিত পরীক্ষার ফলাফল সম্ভবত প্রকাশিত হয়েছিল জুলাই মাসের শেষ বা আগস্ট মাসের প্রথমদিকে। মোবাইল ফোন ছিলো না। পরেরদিন শমসেরনগর বাজার থেকে ইত্তেফাক পত্রিকা এনে জানলাম আমি প্রথম বিভাগে পাশ করেছি। এখন যেভাবে জিপিএ ৫ আসে তখন এরচেয়ে কম শিক্ষার্থী প্রথম বিভাগে পাশ করতো। পরে মার্ক শিট এনে দেখলাম রোল নম্বর প্রাঃ ৭৯২২২ থাকায় মনে হয় অনেক বিষয়ে ৭৭ নম্বর পেয়েছি। কিন্তু ৩ মার্কের জন্য লেটার মার্ক ভাগ্যে জোটেনি।

প্রাইভেট পরীক্ষার্থীদের ব্যাপারে নেতিবাচক ধারণা থেকেই এমনটি হতো বলে শুনেছি। পরে মৌলভীবাজার সরকারি কলেজে ভর্তির মধ্য দিয়ে আবার রেগুলার শিক্ষা জীবন শুরু করি। জীবন সংগ্রামে আছে আরো অনেক উত্থান পতনের কাহিনী। (চলবে)

লেখক:- সাংবাদিক ।
সাবেক সভাপতি, প্রেসক্লাব কুলাউড়া।
চেয়ারম্যান, হাজীপুর ইউনিয়ন পরিষদ।